নড়াইল সদরের তুলারামপুরে ঢাকাগামী ‘জাহানাবাদ এক্সপ্রেস’ ট্রেনের নিচে কাটা পড়ে অজ্ঞাত এক ব্যক্তির মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। দেহ থেকে মাথা ও হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া ওই ব্যক্তির পরিচয় শনাক্ত এবং আইনি ব্যবস্থা গ্রহণে কাজ করছে পুলিশ ও রেলওয়ে পুলিশ (জিআরপি)।

‘খুলনা-নড়াইল-ঢাকা রেললাইনে ভয়াবহ দুর্ঘটনা’: তুলারামপুরে জাহানাবাদ এক্সপ্রেসে কাটা পড়ে নিহত অজ্ঞাত ব্যক্তি; শরীর ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন
কাজী আতিকুর রহমান, জেলা প্রতিনিধি, নড়াইল: খুলনা-নড়াইল-ঢাকা নবনির্মিত ট্রেন রুটে এক হৃদয়বিদারক ও মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় অজ্ঞাতনামা এক পুরুষ নিহত হয়েছেন। দ্রুতগামী ট্রেনের নিচে কাটা পড়ে ওই ব্যক্তির শরীর ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে মাথা, হাত ও শরীরের একাধিক অংশ আলাদা হয়ে গেছে। মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনাটি ঘটেছে নড়াইল সদর উপজেলার তুলারামপুর এলাকায়।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬) সকাল সাড় ৭টার দিকে তুলারামপুর নামক স্থানের ‘তানভীর তেল পাম্পের’ ঠিক বিপরীত পাশে ঢাকা-খুলনা মূল রেললাইনে এই দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনার বিকট শব্দ ও খবর ছড়িয়ে পড়তেই স্থানীয় শত শত উৎসুক জনতা দুর্ঘটনাস্থলে ভিড় জমান। নিহত ব্যক্তির পরিচয় এখনো পাওয়া যায়নি।
দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও প্রত্যক্ষ বিবরণ
ঘটনাস্থল ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সকালের দিকে খুলনা থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী আন্তঃনগর ‘জাহানাবাদ এক্সপ্রেস’ ট্রেনটি দ্রুত গতিতে নড়াইল রেলস্টেশনের দিকে প্রবেশ করছিল। ট্রেনটি নড়াইল রেলস্টেশনে পৌঁছানোর পূর্ব মুহূর্তে তুলারামপুর এলাকায় তানভীর তেল পাম্পের বিপরীতে এলে ওই অজ্ঞাত ব্যক্তি রেললাইনের ওপর চলে আসেন। চলন্ত ট্রেনের সাথে প্রচণ্ড ধাক্কা লাগার পর তিনি ট্রেনের নিচে কাটা পড়েন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ট্রেনের ইঞ্জিনের নিচে পড়ে চাকার ঘর্ষণে মুহূর্তের মধ্যে লোকটির দেহ কয়েক টুকরো হয়ে যায়। তাঁর মাথা, হাত এবং মূল দেহাংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে রেললাইনের আশপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে। ঘটনাস্থলেই তাঁর আকস্মিক মৃত্যু ঘটে। দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে নড়াইল সদর থানা পুলিশকে দ্রুত বিষয়টি অবহিত করা হয়।
এক নজরে নড়াইল ট্রেন দুর্ঘটনার সারসংক্ষেপ
| পর্যালোচনার ক্ষেত্র | বিস্তারিত তথ্য ও বিবরণ |
| দুর্ঘটনাস্থল | তানভীর তেল পাম্পের বিপরীত দিক, তুলারামপুর, নড়াইল সদর |
| দুর্ঘটনার তারিখ ও সময় | বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬; সময়: সকাল সাড়ে ৭টা |
| জড়িত ট্রেনের নাম | খুলনা থেকে ঢাকাগামী ‘জাহানাবাদ এক্সপ্রেস’ |
| নিহতের পরিচয় | অজ্ঞাতনামা পুরুষ (আনুমানিক বয়স ও নাম পরিচয় মেলেনি) |
| আঘাতের ধরন | ট্রেনে কাটা পড়ে মাথা, হাত ও দেহ সম্পূর্ণ ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন |
| প্রাথমিক ধারণা | নিহত ব্যক্তি মানসিক ভারসাম্যহীন হতে পারেন বলে পুলিশ ও স্থানীয়দের অনুমান |
| দায়িত্বপ্রাপ্ত থানা/আইনশৃঙ্খলা বাহিনী | নড়াইল সদর থানা পুলিশ ও জিআরপি (রেলওয়ে পুলিশ) |
নিহত ব্যক্তির মানসিক অবস্থা ও স্থানীয়দের বক্তব্য
দুর্ঘটনাস্থলে উপস্থিত স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দুর্ঘটনার কিছুক্ষণ আগেও ওই ব্যক্তিকে আশপাশের এলাকায় ভবঘুরের মতো ঘোরাঘুরি করতে দেখা গিয়েছিল। তাঁর পরনে থাকা পোশাক ও হাবভাব দেখে স্থানীয় অনেকেরই ধারণা, তিনি হয়তো মানসিক ভারসাম্যহীন বা মানসিক প্রতিবন্ধী ছিলেন।
রেললাইনের ওপর দিয়ে হাঁটার সময় দ্রুতগামী ট্রেনের সাইরেন শুনতে না পাওয়া কিংবা ট্রেন আসার বিষয়টিতে উদাসীন থাকার কারণেই হয়তো তিনি সরতে পারেননি এবং এই মর্মান্তিক পরিণতির শিকার হয়েছেন। তবে তিনি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়েছেন নাকি অসাবধানতাবশত এই দুর্ঘটনা ঘটেছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
পুলিশ প্রশাসন ও আইনি কার্যক্রম
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে নড়াইল সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাসেল সরোয়ার জানান, স্থানীয় মাধ্যমে খবর পেয়ে নড়াইল সদর থানা পুলিশের একটি বিশেষ দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় এবং দুর্ঘটনাস্থল কর্ডন করে রাখে।
ওসি রাসেল সরোয়ার বলেন:
“আমরা খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশের একটি টিম ঘটনাস্থলে পাঠাই। সুরতহাল তৈরিসহ প্রয়োজনীয় প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। যেহেতু রেললাইনের ওপর এই দুর্ঘটনা ঘটেছে, তাই বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে যশোর/খুলনা রেলওয়ে পুলিশকে (জিআরপি) জানানো হয়েছে। রেলওয়ে পুলিশ এসে মরদেহ উদ্ধার ও পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।”
পরিচয় শনাক্তকরণ ও ফিঙ্গারপ্রিন্ট প্রযুক্তি
নিহত ব্যক্তির শরীর অত্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে স্বজনদের সনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। নড়াইল থানা পুলিশ সূত্রে জানানো হয়েছে, নিহতের পরিচয় উদ্ঘাটনে পিবিআই (পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন) বা সিআইডির ফরেনসিক টিমকে যুক্ত করা হতে পারে। বিচ্ছিন্ন হওয়া আঙুলের ছাপ (Fingerprint) বায়োমেট্রিক জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) ডেটাবেজের সাথে মিলিয়ে তাঁর পরিচয় বের করার চেষ্টা চালানো হবে।
মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য নড়াইল আধুনিক সদর হাসপাতাল মর্গে প্রেরণের প্রক্রিয়া চলছে। আইনি প্রক্রিয়া শেষে যদি কোনো স্বজন বা ওয়ারিশ দাবিদার না পাওয়া যায়, তবে অঞ্জুমানে মফিদুল ইসলাম বা স্থানীয় সরকারি সহায়তায় দাফন সম্পন্ন করা হতে পারে।
খুলনা-নড়াইল রেললাইনে সচেতনতার তাগিদ
পদ্মা সেতু হয়ে খুলনা-নড়াইল-ঢাকা রেলপথ চালু হওয়ার পর থেকে এই রুটে ট্রেনের গতি ও চলাচলের সংখ্যা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিনিয়ত দ্রুতগামী ট্রেন যাতায়াত করায় সাধারণ মানুষকে রেললাইন পারাপারে সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। বিশেষ করে আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকার নিকটবর্তী খোলা রেললাইনে অবহেলা করে চলাফেরা না করার পরামর্শ দিয়েছেন সচেতন মহল।
