
ভারতে আদিবাসী, দলিত এবং বাংলাভাষী মুসলিমসহ বঞ্চিত জাতিগোষ্ঠীর সুরক্ষা জোরদারের আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘের বৈষম্যবিরোধী কমিটি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ—পড়ুন বিস্তারিত।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ভারতে বসবাসকারী আদিবাসী জনগোষ্ঠী, দলিত সম্প্রদায় এবং বাংলাভাষী মুসলিমসহ বিভিন্ন বঞ্চিত জাতিগোষ্ঠীর অধিকার ও সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করার জন্য ভারত সরকারের প্রতি জোর আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘের বর্ণবৈষম্য দূরীকরণ সংক্রান্ত কমিটি (CERD)। একই সাথে দেশটির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে ওঠা বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্যাতন, অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, বেআইনি আটক এবং নারীদের ওপর যৌন সহিংসতার মতো গুরুতর অভিযোগগুলো নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বৈশ্বিক এই মানবাধিকার সংস্থাটি।
জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের অধীনে পরিচালিত এই কমিটির পর্যালোচনা বৈঠক শেষে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে ভারতের মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ব্যবস্থার নানাদিক তুলে ধরা হয়।
আদিবাসী, দলিত ও বাংলাভাষী মুসলিমদের সুরক্ষায় জোর: জাতিসংঘের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী প্রতিনিয়ত নানা রূপ বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। বিশেষ করে আদিবাসী (Scheduled Tribes), দলিত সম্প্রদায় (Scheduled Castes) এবং বাংলাভাষী মুসলিম জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক হেয়প্রতিপন্নতা, ভূমি দখল, এবং মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
কমিটি ভারত সরকারকে পরামর্শ দিয়ে বলেছে, কেবল কাগজে-কলমে আইন থাকা যথেষ্ট নয়; এই অবহেলিত জনগোষ্ঠী যেন বাস্তবে সকল রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকার ভোগ করতে পারে তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। বিশেষ করে বাংলাভাষী মুসলিমদের নাগরিকত্ব হরণ বা বেআইনিভাবে তাদের অভিবাসী হিসেবে চিহ্নিত করার যে প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে, সে বিষয়ে নিরপেক্ষ পদক্ষেপ গ্রহণ এবং আইনগত সুরক্ষা দেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিপীড়ন নিয়ে জাতিসংঘের উদ্বেগ: প্রতিবেদনে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একশ্রেণির কর্মকর্তার আচরণ ও অপপ্রয়োগকে। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ কমিটি বলেছে, দেশের বিভিন্ন স্থানে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, হেফাজতে নির্যাতন, প্রতিবাদ আন্দোলন দমনে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া বেআইনি আটক এবং নারী ও সংখ্যালঘুদের ওপর যৌন সহিংসতার মতো মারাত্মক মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে।
কমিটি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে যে, এসব অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত প্রশাসনিক বা নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অনেক সময় উপযুক্ত তদন্ত বা শাস্তি নিশ্চিত করা হয় না। ফলে ‘বিচারহীনতার সংস্কৃতি’ উৎসাহিত হচ্ছে। সংস্থাটি ভারত সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছে, যেন এসব গুরুতর অভিযোগের নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত পরিচালনা করে দোষীদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হয়।
জাতিগত সহিংসতা ও Hate Speech প্রতিরোধে পদক্ষেপ: কমিটির পর্যালোচনায় ভারতে উগ্র জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি বৃদ্ধি, ধর্মীয় ও সামাজিক বিদ্বেষমূলক বক্তব্য (Hate Speech) এবং নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। অনলাইনে ও সরাসরি রাজপথে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক গোষ্ঠীর মাধ্যমে সংখ্যালঘু ও আদিবাসীদের টার্গেট করে দেওয়া বিদ্বেষমূলক বক্তব্য বন্ধে দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নিতে সুপারিশ করা হয়েছে।
এছাড়াও মনিপুর সহ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে সামপ্রদায়িক বা জাতিগত সংঘাতের ফলে বাস্তুচ্যুত হওয়া হাজার হাজার আদিবাসী ও সাধারণ মানুষের জন্য পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ, নিরাপত্তা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করার প্রতি জোর দেওয়া হয়।
আন্তর্জাতিক চুক্তি মেনে চলার তাগিদ: জাতিসংঘের বর্ণবৈষম্য দূরীকরণ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সনদ (ICERD)-এ স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে ভারতের ওপর যে বৈশ্বিক দায়বদ্ধতা রয়েছে, তা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে সংস্থাটি। সংখ্যালঘু ও দুর্বল জনগোষ্ঠীর জন্য ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ সুগম করা, বিনামূল্যে আইনি সহায়তা দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ সংস্থাকে দেশে কাজ করার অবাধ সুযোগ দেওয়া উচিত বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
জাতিসংঘের এই কড়া বার্তা ও পর্যালোচনা প্রকাশ পাওয়ার পর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার অঙ্গনে যেমন তোলপাড় শুরু হয়েছে, তেমনি ভারতের মানবাধিকার পরিস্থিতি পুনর্মূল্যায়নে বিশ্ব সম্প্রদায়ের দৃষ্টি তৈরি হয়েছে।
