
লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা সীমান্তে জিরো লাইন অতিক্রম করে আসা দুই বিএসএফ সদস্যের সঙ্গে বাংলাদেশি কৃষকদের ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটেছে। এতে বিএসএফ সদস্যরা অস্ত্র ও ওয়াকিটকি ফেলে পালিয়ে যান। পরে বিজিবির পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে তা ফেরত দেওয়া হয়। পড়ুন বিস্তারিত।
বিশেষ প্রতিবেদক: লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার গোতামারী ইউনিয়নের আমঝোল সীমান্তে আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন লঙ্ঘন করে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালানো ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) দুই সদস্যের সাথে স্থানীয় বাংলাদেশি কৃষকদের ধস্তাধস্তির এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে। কৃষকদের তীব্র প্রতিরোধ ও ধস্তাধস্তির মুখে বিএসএফ সদস্যরা তাদের ব্যবহৃত দুটি শর্টগান ও একটি ওয়াকিটকি সেট ফেলে দ্রুত ভারতের অভ্যন্তরে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন।
পরে খবর পেয়ে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধারকৃত আগ্নেয়াস্ত্র ও যোগাযোগের সরঞ্জাম নিজেদের হেফাজতে নেয়। ঘটনাকে কেন্দ্র করে সীমান্তে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে উভয় বাহিনীর মধ্যে জরুরি পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বিজিবির কড়া প্রতিবাদের পর আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শেষে উদ্ধারকৃত সরঞ্জাম বিএসএফের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত ও সীমান্ত অনুপ্রবেশ: স্থানীয় ও বিজিবি সূত্র জানায়, মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) দুপুরের দিকে হাতীবান্ধা উপজেলার গোতামারী ইউনিয়নের আমঝোল সীমান্তের প্রধান পিলার নম্বর ৯০১-এর কাছে এ অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি ঘটে। উক্ত সময়ে বাংলাদেশি সীমান্তের অভ্যন্তরে নিজ জমিতে স্বাভাবিক কৃষি কাজ করছিলেন স্থানীয় কয়েকজন কৃষক।
অভিযোগ উঠেছে, ভারতের ১০০ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের আমঝোল ক্যাম্পের দুই সশস্ত্র বিএসএফ সদস্য বিনা উসকানিতে জিরো লাইন অতিক্রম করে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে প্রবেশ করেন। তারা ধানক্ষেতে কর্মরত বাংলাদেশি কৃষকদের ওপর চড়াও হন এবং অহেতুক গালাগালি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করে তাদের আটকে রাখার চেষ্টা করেন।
কৃষকদের প্রতিরোধ ও বিএসএফের পিছুটান: বিএসএফের অন্যায্য আচরণ ও বেআইনি অনুপ্রবেশ দেখে সেখানে কর্মরত কৃষকরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। তারা একত্র হয়ে বিএসএফ সদস্যদের বেআইনি পদক্ষেপে বাধা দেন। একপর্যায়ে বিএসএফ সদস্যরা কৃষকদের ওপর বলপ্রয়োগের চেষ্টা করলে উভয়ের মধ্যে হাতাহাতি ও ধস্তাধস্তি শুরু হয়ে যায়।
বাংলাদেশি কৃষকদের সাহসিকতা ও সুসংগঠিত প্রতিরোধ দেখে বিএসএফ সদস্যরা ভীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েন। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে বিএসএফের হাতে থাকা দুটি শর্টগান এবং একটি ওয়াকিটকি সেট মাটিতে পড়ে যায়। পরিস্থিতি প্রতিকূলে দেখে অস্ত্র ও সরঞ্জামাদি ফেলে রেখে তড়িঘড়ি করে জিরো লাইন অতিক্রম করে নিজ সীমানায় পালিয়ে যান ভারতীয় সীমান্তরক্ষীরা।
বিজিবির ঘটনাস্থল পরিদর্শ ও সরঞ্জাম উদ্ধার: ঘটনার পরপরই স্থানীয় কৃষকরা বিষয়টি দ্রুত নিকটস্থ বিজিবি আমঝোল বিওপি (বর্ডার আউটপোস্ট) এবং হাতীবান্ধা উপজেলার তিস্তা ব্যাটালিয়ন-২ (৬১ বিজিবি)-এর জওয়ানদের অবহিত করেন। সংবাদ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিজিবির একটি সুসজ্জিত টহল দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়।
বিজিবি সদস্যরা ঘটনাস্থলে তল্লাশি চালিয়ে বিএসএফের ফেলে যাওয়া দুটি শর্টগান এবং একটি ওয়াকিটকি সেট উদ্ধার করে ক্যাম্পের হেফাজতে নিয়ে নেন। একই সাথে সীমান্তে কোনো প্রকার অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে বিজিবির অতিরিক্ত টহল জোরদার করা হয় এবং আমঝোল সীমান্ত এলাকায় সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করা হয়।
পতাকা বৈঠক ও কড়া প্রতিবাদ বিনিময়: বিএসএফের অস্ত্র ও ওয়াকিটকি উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়লে সীমান্তজুড়ে ব্যাপক গুঞ্জন ও তোলপাড় শুরু হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ভারতীয় বিএসএফ কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে জরুরিভিত্তিতে পতাকা বৈঠকের আহ্বান জানানো হয়।
মঙ্গলবার বিকেলেই জিরো লাইনে বিজিবি ও বিএসএফের ব্যাটালিয়ন এবং কোম্পানি কমান্ডার পর্যায়ে এক জরুরি পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিজিবির পক্ষে ৬১ বিজিবির দায়িত্বশীল কর্মকর্তা এবং বিএসএফের ১০০ ব্যাটালিয়নের শীর্ষ কর্মকর্তারা অংশ নেন।
বৈঠকে বিজিবির পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন লঙ্ঘন করে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ এবং নিরীহ কৃষকদের হেনস্তা করার তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়। ভবিষ্যতে যেন এমন বেআইনি ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে বিষয়ে বিএসএফকে স্পষ্ট ও কঠোর বার্তা দেওয়া হয়। পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় দাপ্তরিক ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে উদ্ধার হওয়া দুটি শর্টগান ও ওয়াকিটকি সেট বিএসএফের প্রতিনিধি দলের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করে বিজিবি।
স্থানীয় অধিবাসী ও সীমান্ত নিরাপত্তা: ঘটনার পর থেকে হাতীবান্ধার গোতামারী ও আশপাশের সীমান্ত এলাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের স্বস্তি ও নিজেদের অধিকার রক্ষার গৌরব দেখা গেছে। স্থানীয় অধিবাসীরা অভিযোগ করেন, প্রায়শই বিএসএফের সদস্যরা সীমান্ত আইন অমান্য করে বাংলাদেশের সীমানায় প্রবেশ করে কৃষকদের ধমকাধমকি করে থাকে। তবে মঙ্গলবারের ঘটনা বিএসএফের জন্য একটি বড় বার্তা হয়ে থাকবে।
বিজিবির দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, “সীমান্তে যেকোনো প্রকার অনুপ্রবেশ বা বিশৃঙ্খলা বরদাশত করা হবে না। সীমান্ত রক্ষা ও দেশের নাগরিকদের নিরাপত্তা প্রদানে বিজিবি সর্বদা প্রস্তুত ও সতর্ক রয়েছে। বিএসএফের অনুপ্রবেশের ঘটনার কড়া বার্তা দেওয়া হয়েছে।”
