
লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা সীমান্তের আমঝোল এলাকায় বাংলাদেশে ঢুকে কৃষকদের মারধরের অভিযোগে বিএসএফের ওপর চড়াও হয় স্থানীয়রা। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে দুটি শটগান ও একটি ওয়াকিটকি ফেলে পালায় বিএসএফ সদস্যরা। পরবর্তীতে বিজিবির উপস্থিতিতে পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে উদ্ধারকৃত অস্ত্র ও ওয়াকিটকি ভারতের হাতে ফেরত দেওয়া হয়। বিস্তারিত পড়ুন প্রতিবেদনটিতে।
বিশেষ প্রতিনিধি, লালমনিরহাট: লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার গোতামারী ইউনিয়নের আমঝোল সীমান্তে অবৈধভাবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে স্থানীয় কৃষকদের মারধর ও লাঞ্ছিত করার মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) বিরুদ্ধে। এ সময় ক্ষুব্ধ স্থানীয় সীমান্তবাসীর তীব্র প্রতিরোধ ও ধস্তাধস্তির মুখে বিএসএফের টহল দলের সদস্যরা তাদের ব্যবহৃত দুটি শটগান এবং একটি ওয়াকিটকি ফেলে রেখে ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।
পরবর্তীতে স্থানীয় সীমান্তবাসী উদ্ধার হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র ও যোগাযোগ সরঞ্জাম সীমান্ত রক্ষা বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) কাছে জমা দেন। মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) দুপুর ১টার দিকে আমঝোল সীমান্তের ৯০৭ নম্বর মেইন পিলারের কাছে এ অভূতপূর্ব ঘটনার সূত্রপাত ঘটে। দিনভর নানা উত্তেজনা ও বিজিবি-বিএসএফ শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যস্থতায় অনুষ্ঠিত এক পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে রাতে আনুষ্ঠানিকভাবে এসব অস্ত্র ও ওয়াকিটকি সেট বিএসএফের প্রতিনিধির হাতে তুলে দেওয়া হয়।
সীমান্তে অনুপ্রবেশ ও হামলার বিবরণ
স্থানীয় বাসিন্দা, প্রত্যক্ষদর্শী ও বিজিবি সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার দুপুরে লালমনিরহাট জেলার হাতীবান্ধা উপজেলার গোতামারী ইউনিয়নের আমঝোল সীমান্তের প্রধান পিলার ৯০৭-এর ২ নম্বর উপ-পিলারের কাছে বাংলাদেশের ভূখণ্ডের ভেতরে বেশ কয়েকজন স্থানীয় বাংলাদেশি কৃষক নিজেদের জমিতে স্বাভাবিক কৃষিকাজ করছিলেন।
হঠাৎ করে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কুচবিহার জেলার ৭৮ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের পাগলীমারী ক্যাম্পের একটি টহল দল শূন্যরেখা অতিক্রম করে বাংলাদেশের প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ গজ অভ্যন্তরে বেআইনিভাবে প্রবেশ করে। আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন লঙ্ঘন করে বিএসএফ সদস্যরা জমিতে কর্মরত বাংলাদেশি কৃষকদের ওপর চড়াও হয় এবং কোনো কারণ ছাড়াই অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ শুরু করে। একপর্যায়ে বিএসএফ জওয়ানরা তাদের হাতে থাকা লাঠি ও রাইফেলের বাট দিয়ে কৃষকদের বেদম মারধর করতে থাকে।
সীমান্তবাসীর প্রতিরোধ ও বিএসএফের পিছু হঠন
বিএসএফের এই অন্যায় ও আচমকা হামলায় কৃষকদের চিৎকারে আশপাশের ভিটা-বাড়ি ও অন্যান্য জমি থেকে স্থানীয় শত শত বাংলাদেশি সীমান্তবাসী লাঠিসোটা নিয়ে দ্রুত দুর্ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। বিএসএফের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের বিরুদ্ধে তারা প্রতিবাদ গড়ে তোলেন।
একপর্যায়ে বিএসএফ টহল দলের ৩ জন সদস্যের সাথে ক্ষুব্ধ সীমান্তবাসীর হাতাহাতি ও ধস্তাধস্তি শুরু হয়। স্থানীয়দের সম্মিলিত এবং সাহসী প্রতিরোধের মুখে ভারতীয় বিএসএফ সদস্যরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। তীব্র ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে বিএসএফ সদস্যরা নিজেদের সামলাতে না পেরে সাথে থাকা দুটি লেথাল/অটোমেটিক শটগান এবং একটি ওয়াকিটকি সেট ঘটনাস্থলেই ফেলে রেখে তড়িঘড়ি করে ভারতের ভূখণ্ডের দিকে পালিয়ে যায়।
অস্ত্র উদ্ধার ও বিজিবির ভূমিকা
ঘটনার পরপরই স্থানীয় জনগণ বিএসএফ সদস্যদের ফেলে যাওয়া শটগান দুটি এবং ওয়াকিটকি সেটটি সযত্নে উদ্ধার করেন। খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় বিজিবির সিঙ্গিমারী বিওপির (বর্ডার অবজারভেশন পোস্ট) একটি সশস্ত্র টহল দল। স্থানীয় অধিবাসীরা উদ্ধারকৃত অস্ত্র ও ওয়াকিটকি বিজিবি সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করেন এবং সীমান্তের নিরাপত্তার জোরদার দাবিসহ ঘটনার সুষ্ঠু বিচারের দাবি জানান।
ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের দুই পারেই তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা যেন না ঘটে, সেজন্য বিজিবি দ্রুত সীমান্ত এলাকায় অতিরিক্ত টহল ও সতর্ক অবস্থান জোরদার করে।
বিজিবি-বিএসএফ পতাকা বৈঠক ও অস্ত্র হস্তান্তর
ঘটনার পর বিএসএফের পক্ষ থেকে দ্রুত বিজিবির সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয় এবং ফেলে যাওয়া অস্ত্র ও ওয়াকিটকি ফেরত পাওয়ার আবেদন জানানো হয়। সীমান্তে চলমান উত্তেজনা প্রশমন ও ঘটনার আনুষ্ঠানিক নিষ্পত্তির লক্ষ্যে মঙ্গলবার বিকালে বিজিবি ও বিএসএফের ব্যাটালিয়ন পর্যায়ে এক জরুরি পতাকা বৈঠক (Flag Meeting) আহ্বান করা হয়।
আমঝোল সীমান্তের শূন্যরেখায় অনুষ্ঠিত উক্ত পতাকা বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে নেতৃত্ব দেন বিজিবি-১৫ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক এবং ভারতের পক্ষে নেতৃত্ব দেন ৭৮ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত অধিনায়ক।
দীর্ঘ আলোচনার পর, বিজিবি বিএসএফের অবৈধ অনুপ্রবেশ ও বাংলাদেশি নাগরিকদের ওপর হামলার তীব্র প্রতিবাদ জানায়। ভবিষ্যতের জন্য বিএসএফকে সতর্ক করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন মেনে চলার কঠোর বার্তা দেওয়া হয়। পরবর্তীতে সকল আইনি প্রক্রিয়া শেষে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও উভয় বাহিনীর কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে উদ্ধারকৃত দুটি শটগান এবং একটি ওয়াকিটকি সেট আনুষ্ঠানিকভাবে বিএসএফের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
সীমান্তবাসীর প্রতিক্রিয়া ও সার্বিক পরিস্থিতি
স্থানীয় গোতামারী ইউনিয়নের অধিবাসীরা জানান, বিএসএফ প্রায়শই সীমানা অতিক্রম করে বাংলাদেশি ভূখণ্ডে এসে সাধারণ কৃষকদের ভয়ভীতি দেখায় এবং গবাদিপশু ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। তবে মঙ্গলবারের ঘটনায় স্থানীয়দের তীব্র প্রতিবাদ ও ঐক্যবদ্ধ অবস্থানের কারণে বিএসএফ সদস্যরা পিছু হঠতে বাধ্য হয়। বিজিবির সময়োপযোগী পদক্ষেপ ও সীমান্ত পাহারায় শক্ত অবস্থানের কারণে বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, তবে স্থানীয়দের মাঝে কিছুটা থমথমে ভাব বিরাজ করছে।
