
বিশেষ প্রতিবেদক, নেত্রকোণা: নেত্রকোণার কেন্দুয়া উপজেলায় এক হৃদয়বিদারক ও লোমহর্ষক ঘটনায় দশম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রীকে ভিডিও ফাঁসের ভয় দেখিয়ে দিনের পর দিন দলবদ্ধ ধর্ষণ ও পরবর্তীতে অন্তঃসত্ত্বা করার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী পরিবার কেন্দুয়া থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন এবং পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি মামলা দায়ের করেছে।
মামলা দায়েরের পর পুলিশ তৎক্ষণাৎ অভিযান চালিয়ে ঘটনার দ্বিতীয় আসামি আবু মিয়াকে (৩৬) গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হলেও প্রধান আসামি কেন্দুয়া পৌর বিএনপির সহ-যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও ৫ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বকুল মিয়া (৫০) বর্তমানে পলাতক রয়েছেন।
ঘটনার সূত্রপাত ও ব্লাকমেইলের ইতিহাস: মামলার এজাহার ও ভুক্তভোগীর পারিবারিক সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, পাশবিক এই নির্যাতনের সূচনা ঘটেছিল ২০২২ সালের শেষের দিকে। তৎকালীন সময়ে ভুক্তভোগী কিশোরী একটি স্থানীয় মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী ছিল।
২০২২ সালের ২০ নভেম্বর অভিযুক্ত বকুল মিয়া ফুসলিয়ে ও সুকৌশলে কিশোরীকে একটি ফাঁকা বাড়িতে নিয়ে যান এবং সেখানে তাকে প্রথমবার জোরপূর্বক ধর্ষণ করেন। পাশবিক এই ঘটনার সময় বকুল মিয়া অত্যন্ত গোপনে তাঁর মুঠোফোনে ধর্ষণের চিত্র ভিডিও ধারণ করে রাখেন।
পরবর্তীতে এই গোপন ভিডিও চিত্রই হয়ে ওঠে ওই কিশোরীর জীবনের জন্য এক স্থায়ী অভিশাপ। ভিডিওটি ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে বকুল মিয়া ও তাঁর সহযোগী আবু মিয়া দীর্ঘদিন ধরে ওই কিশোরীকে ব্ল্যাকমেইল করতে থাকেন। ভিডিও ফাঁসের আতঙ্কে ও সামাজিক লোকলজ্জার ভয়ে কিশোরীটি কারও কাছে মুখ খোলার সাহস পায়নি। এই সুযোগে অভিযুক্তরা বিভিন্ন সময়ে তাঁকে শারীরিক ও মানসিকভাবে লাঞ্ছিত এবং বারবার ধর্ষণ করে।
ঘটনা প্রকাশ্যে আসার নেপথ্য ও অন্তর্বাস ট্র্যাজেডি: দিনের পর দিন চলা এই অন্যায্য নির্যাতনের ফলে সম্প্রতি ওই স্কুলছাত্রীর শারীরিক পরিবর্তন দেখা দেয়। চিকিৎসকের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ডাক্তারি পরীক্ষার পর নিশ্চিত হওয়া যায় যে, দশম শ্রেণির ওই শিক্ষার্থী বর্তমানে গর্ভবতী (অন্তঃসত্ত্বা)।
বিষয়টি জানার পর কিশোরীর পরিবার ভেঙে পড়ে এবং স্বজনদের কাছে কেঁদে কেঁদে সে দীর্ঘ চার বছর ধরে চলা ব্লাকমেইল ও পাশবিক নির্যাতনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা বিস্তারিত প্রকাশ করে। এরপরই ভুক্তভোগী কিশোরীর অভিভাবক ন্যায়বিচারের আশায় সরাসরি কেন্দুয়া থানায় উপস্থিত হয়ে মামলা দায়ের করেন।
পুলিশের পদক্ষেপ ও প্রধান আসামির আত্মগোপন: অভিযোগ পাওয়ার সাথে সাথে কেন্দুয়া থানা পুলিশ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিষয়টি আমলে নেয়। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার নেতৃত্বে একটি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে এজাহারভুক্ত দ্বিতীয় আসামি আবু মিয়াকে (৩৬) স্বাবলম্বী এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃত আবু মিয়াকে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদের পর আইনি প্রক্রিয়া শেষে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
তবে ঘটনার প্রধান পরিকল্পনাকারী ও মূল ধর্ষক কেন্দুয়া পৌর বিএনপির স্থানীয় নেতা বকুল মিয়া (৫০) মামলা দায়েরের খবর পেয়ে এলাকা থেকে চম্পট দিয়েছেন। পুলিশ জানিয়েছে, আসামিকে গ্রেপ্তারে তাঁদের একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে এবং সম্ভাব্য সকল আস্তানায় সাঁড়াশি অভিযান চালানো হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বক্তব্য ও সুধী সমাজের প্রতিক্রিয়া: কেন্দুয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, “ভুক্তভোগীর অভিযোগের ভিত্তিতে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন এবং পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা রুজু করা হয়েছে। ইতিমধ্যে ঘটনার সাথে জড়িত একজন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং ডাক্তারি আলামত সংগ্রহের জন্য তাঁকে নেত্রকোণা আধুনিক সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। প্রধান আসামি বকুল মিয়াকে অতি দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রেপ্তার করে আইনি প্রক্র মুখোমুখি করা হবে।”
এদিকে স্থানীয় আলেম সমাজ, মানবাধিকার কর্মী ও সাধারণ অধিবাসীরা এ ধরনের নৃসংশ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। একজন রাজনৈতিক দলের দায়িত্বশীল পদে থেকে নাবালিকা স্কুলছাত্রীর জীবন ধ্বংস এবং তাকে ব্লাকমেইল করার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে অবিলম্বে অভিযুক্ত বকুল মিয়াকে দল থেকে বহিষ্কার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হয়েছে।
