
জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জোটে ফাটল ও এনসিপি বেরিয়ে যাওয়ার গুঞ্জন নিয়ে মুখ খুলেছেন জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান। বাংলামোটরে এনসিপি কার্যালয়ে গিয়ে তিনি স্পষ্টভাবে জানান, তাদের মধ্যে নির্বাচনী ঐক্য ও রাজপথের আন্দোলন বজায় রয়েছে। বিস্তারিত পড়ুন।
বিশেষ প্রতিবেদক, ঢাকা: দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মধ্যকার জোট বা নির্বাচনী ঐক্য নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা-সমালোচনা এবং জল্পনা-কল্পনা চলছে। বিশেষ করে, সাম্প্রতিক সময়ে ১১-দলীয় ঐক্য থেকে এনসিপি বা অন্য কোনো দল বেরিয়ে যেতে পারে—এমন গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়লে তা নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে কৌতূহল সৃষ্টি হয়।
তবে এসব গুঞ্জন ও ফাটলের জল্পনাকে পুরোপুরি নাকচ করে দিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও স্বভাবসুলভ রসবোধের মাধ্যমে জবাব দিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি মন্তব্য করেছেন, “যার বিয়ে তার ঠেকা নাই, পাড়াপড়শির ঘুম নাই।” অর্থাৎ, যাদের মধ্যে মূল ঐক্য বা বোঝাপড়া রয়েছে, তাদের মধ্যে কোনো সংকট না থাকলেও বাইরের পক্ষগুলো এ নিয়ে নানা রকম বিভ্রান্তি ও উত্তেজনা ছড়ানোর চেষ্টা করছে।
এনসিপি কার্যালয়ে জামায়াত আমিরের হঠাৎ সফর
রাজধানীর বাংলামোটরে অবস্থিত জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে উপস্থিত হয়ে জামায়াত আমির এই প্রতিক্রিয়া জানান। বৈঠকে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য জাহিদুর রহমান সহ একাধিক শীর্ষ নেতা উপস্থিত ছিলেন। অন্যদিকে এনসিপি-র পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন দলের আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মো. নাহিদ ইসলাম, ছাত্রশক্তি, যুবশক্তি ও নারীশক্তির বিভিন্ন স্তরের শীর্ষ নেতাকর্মীবৃন্দ।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে জোটে ফাটল বা এনসিপির জোট ত্যাগ সংক্রান্ত সরাসরি প্রশ্নের মুখোমুখি হন ডা. শফিকুর রহমান।
“ফরমাল জোট নয়, এটি নির্বাচনী ঐক্য”
জোটের স্বরূপ ও ভবিষ্যৎ রূপরেখা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জামায়াত আমির বলেন, “আমরা তো সেই অর্থে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা ‘ফরমাল’ জোট গঠন করিনি। আমরা মূলত একটি নির্বাচনী ঐক্য বা বোঝাপড়া তৈরি করেছিলাম। আর নির্বাচন উত্তর এই মুহূর্তে দেশের সাধারণ মানুষের অধিকার আদায় ও জনস্বার্থে আমরা একসঙ্গে রাজপথে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছি।”
তিনি অতীতের জোট রাজনীতির বিভিন্ন অভিজ্ঞতার উদাহরণ টেনে বলেন, “বাংলাদেশে জোটের রাজনীতি সর্বদা পরিবর্তনশীল। অতীতে আমরা চার দলীয় ঐক্যজোট দিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলাম। সেখান থেকে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বেরিয়ে গেলেও তাঁর দলের একাংশ নাজিউর রহমান মঞ্জুরের নেতৃত্বে আমাদের সাথে থেকে যায়। পরবর্তীতে চার দল থেকে ১৮ দল, ২০ দল এবং একপর্যায়ে আমরা ২৭টি রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ও দেখেছি। তবে রাজনৈতিক পরিভাষায় ‘২০-দলীয় জোট’ একটি ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল।”
গণতন্ত্রে প্রত্যেকের প্ল্যাটফর্ম নির্বাচনের অধিকার রয়েছে
জোটবদ্ধ রাজনীতিতে মতপার্থক্য থাকাটা স্বাভাবিক উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রতিটা রাজনৈতিক দলের নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার এবং তাদের পছন্দ অনুযায়ী প্ল্যাটফর্ম বেছে নেওয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে। আমরা কাউকে আমাদের সাথে থাকার জন্য জোর করতে পারি না, সেই অধিকার বা একচ্ছত্র ক্ষমতা আমাদের নেই। তবে দেশের বৃহত্তর রাজনৈতিক স্বার্থ, ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার চূড়ান্ত বিলোপ এবং জনকল্যাণের তাগিদে আমরা এই ঐক্যকে আরও বেশি সুসংহত ও শক্তিশালী করার সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাব।”
ছায়ামন্ত্রিসভা (Shadow Cabinet) ও ইন্টেলেকচুয়াল রেমিট্যান্স
সংবাদ সম্মেলনে বিরোধী দলের ভবিষ্যৎ কৌশল সম্পর্কে আলোকপাত করতে গিয়ে জামায়াত আমির একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করেন। তিনি জানান, দেশে একটি সুসংগঠিত ‘ছায়ামন্ত্রিসভা’ (Shadow Cabinet) গঠনের প্রাথমিক কাজ বা ‘হোমওয়ার্ক’ শুরু করেছে বিরোধী জোট।
এই ছায়ামন্ত্রিসভায় শুধু জোটে থাকা শরিক দলের নেতাদেরই নয়, বরং দেশ ও বিদেশে অবস্থানরত অভিজ্ঞ, দক্ষ ও প্রযুক্তিজ্ঞানসম্পন্ন প্রবাসী বিশেষজ্ঞদেরও যুক্ত করা হবে। তিনি এটিকে ‘ইন্টেলেকচুয়াল রেমিট্যান্স’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং বলেন, “আমাদের মেধাবী সন্তানরা পৃথিবীর যেখানেই থাকুক না কেন, দেশের প্রয়োজনে সেই বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদকে আমরা বাংলাদেশে কাজে লাগাব।”
নাহিদ ইসলামের বক্তব্য: রাজপথ ও সংসদে ঐক্যবদ্ধ লড়াই
প্রেস ব্রিফিংয়ে এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মো. নাহিদ ইসলাম জামায়াত আমিরের বক্তব্যের সুরেই সুর মেলান। তিনি বলেন, গণভোটের ঐতিহাসিক রায় এবং জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে দেশের বিরোধী দলগুলো একসূত্রে গাঁথা রয়েছে।
নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, “দেশে এখনো গ্যাস, বিদ্যুৎ, জ্বালানি সংকট ও সার সংকটের মতো মৌলিক নাগরিক সমস্যাগুলো তীব্র আকার ধারণ করেছে। মূল্যস্ফীতি ও দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতিতে সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। কিন্তু সরকার এসব জনগুরুত্বপূর্ণ সমস্যা সমাধানের চেয়ে রাজনৈতিক দমনপীড়ন এবং পুরোনো প্রশাসনিক কাঠামো বজায় রাখতেই বেশি ব্যস্ত।”
তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং জামায়াতে ইসলামী সংসদে গঠনমূলক ভূমিকা পালনের পাশাপাশি সাধারণ জনগণের দাবি আদায়ে রাজপথে সমানভাবে সোচ্চার থাকবে। তারা কোনো চক্রান্তের ফাঁদে পা না দিয়ে গণতান্ত্রিক ও ইসলামপন্থী দলগুলোর সাথে ঐক্য বজায় রেখে আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
রাজনৈতিক সমীকরণ ও সার্বিক বিশ্লেষণ
সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের আসন বিন্যাস এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে চাপানউতোর তৈরি হয়েছে। এর মধ্যেই জামায়াত-এনসিপি জোটে ফাটলের কথা ছড়িয়ে পড়ার পেছনে বিরোধীদের রাজনৈতিক কৌশল থাকতে পারে বলে মনে করছেন মাঠপর্যায়ের বিশ্লেষকরা।
তবে এনসিপি কার্যালয়ে জামায়াত আমিরের সশরীরে উপস্থিতি এবং উভয় দলের যৌথ প্রেস ব্রিফিং রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এর মাধ্যমে এটি পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, কৌশলগত কিছু মতপার্থক্য থাকলেও জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির মধ্যকার রাজনৈতিক এবং আন্দোলনমুখী ঐক্য এখনো বহাল রয়েছে।
সামনের দিনগুলোতে এই দুই শক্তি কীভাবে তাদের রাজপথের কর্মসূচি এবং সংসদীয় কৌশল সমন্বয় করে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
